নরকের দরজা !

Darvaza নরকের দরজা !

তুরকেমিনিস্তানের নরকের দরজা

অতীতে যখন তুরকেমিনিস্তান সোভিয়েত ইউনিয়নের একটি অংশ ছিল, তখন ভুতত্তবিদরা কারকুম মরুভুমির মাঝখানে খনন কাজ চালাচ্ছিলেন। এই মরুভূমির পাথলা, খিটখিটে ভূমির নিচে রয়েছে অসংখ্য অপরিশোধিত তেলের কূপ।

কিন্তু খননের সময় এটি উপরের ওজন সহ্য করতে না পেরে ধসে গিয়ে মস্ত বড় এক গর্তে পরিনত হয়। গর্তটি প্রায় ৭০ মিটার ব্যাস এবং ৩০ মিটার গভীর।

তেলের ডিপোজিট পাবার পরিবর্তে সেখানে তারা খুজে পায় মিথেনের ভান্ডার। উপযুক্ত অবস্থায় এই গ্যাস সংগ্রহ করে তা বিদ্যুৎ উতপাদনে ব্যবহার করা হত। কিন্তু এর জন্য প্রয়োজন ছিল পাইপলাইন বসানো আর ও অনেক ধরনের ব্যয় বহুল কাজ আর একই সাথে সে সময় সোভিয়েত ইউনিয়নে প্রচুর পরিমানে গ্যাসের মজুদ থাকার কারনে এই খরচ করাটাকে তারা যৌক্তিক মনে করেননি।

এসময়ে তারা সবকিছু গূটিয়ে সরে যাচ্ছিলেন কোন সমস্যাই ছিলনা। কিন্তু সমস্যা বাধে যখন ভূতত্তবিদগন এই গ্যাস আশে পাশের পরিবেশের ক্ষতি করবে ভেবে একটা পদ্ধতি ব্যবহার করেন, যাকে বলা হয় ফ্লেরিং।

এই পদ্ধতিতে ইচ্ছাকৃত ভাবে গ্যাসে আগুন ধরিয়ে দেন ফলে তা নিজে থেকে পুড়ে নিঃশেষ হয়ে যায়। বিজ্ঞানিরা ভেবে ছিলেন গ্যাসের এই পকেটটি কয়েকদিন অথবা সর্বচ্চ কয়েক সপ্তাহ ধরে জ্বলে শেষ হয়ে যাবে।

এটা ছিল ১৯৭১ সালের দিকে। আর এই আগুন বিগত ৪৮ বছর ধরে জলছে। এটি আর কতদিন ধরে জ্বলবে সে ব্যপারে এখনো পর্যন্ত কারো কোন ধারনা নেই।

সুবিশাল এই জলন্ত কূপটিকে “গেট ওয়ে টূ হেল” বা “নরকের দ্বারদেশ” বলে আখ্যা দেয়া হয়। এটি অনেকদিন থেকেই পর্যটকদের কাছে বড় একটি আকর্ষণ হয়ে আছে। এটি যে কারনে অন্য যেকোন পর্যটন কেন্দ্র থেকে আলাদা হবার কারন আসলে এটির নাজুক ও বিপদজনক অবস্থা। এর ধারেকাছে আপনি কোন দোকান, লোকালয় বা রাস্তাও পাবেননা।

আর আসলে এখানে বেড়াতে যাওয়াটাও খুব একটা বুদ্ধিমানের মত কাজ হবেনা! কারন প্রায় পঞ্চাশ বছর ধরে জ্বলতে থাকার কারনে এটির চারপাশ যেকোন সময়ে আবারও ধসে পড়তে পারে।

পেনিসুল্ভানিয়ার সেন্ট্রালিয়া

তবে এটাই কিন্তু এ ধরনের ঘটনার একমাত্র উদাহরন নয়। ১৯৬৪ সালে, সেন্ট্রালিয়া, পেনিসুল্ভানিয়ার একটি ছোট খনির শহরে একটি বড় সমস্যা হয়েছিল। তাদের ভূমি ময়লায় পূর্ণ হয়ে যাওয়ায় তাতে ইদুরের উপদ্রব ঘটে। এছাড়া তিব্র গন্ধ তো ছিলই। সিটি কাউন্সিল এই ময়লা সমস্যার সমাধানের জন্য একটি সহজ সমাধানে মস্তবড় একটি ভূল সিদ্ধান্ত নেয়।

নরকের দরজা !

তারা এটিতে আগুন দিয়ে দেয়। সমস্যা হল এই ময়লার ডিপোজিটটি ছিল একটি পরিত্যাক্ত খনির উপরে। প্রাথমিক ভাবে শহরে মানুষ এটায় তেমন গুরুত্ব দেয়নি। কিন্তু বিপুল পরিমানে কয়লার উপস্থিতির কারনে এখানে আগুণ বন্ধ করা প্রায় অসম্ভবই ছিল বলা যায়।

আরো বড় সমস্যা দেখা দেয় যখন আগুন ক্রমশ চারিদিকে এবং শহরেও ছড়িয়ে পড়তে থাকে। কারন এই খনির নিচের টানেলগুলো পুরো শহর জুড়েই বিস্তৃত ছিল। এই আগুন ক্রমশ উপরে উঠে আসে, এবং গর্ত গুলো বিষাক্ত গ্যাসে পূর্ণ হয়ে যায়। রোড ঘাট ভেংগেচুড়ে যেতে থাকে, বাড়িঘড় মাটিতে দেবে যেতে শুরু করে। এছাড়া শহরবাসীদের ঘরে মাটি ধসে গিয়ে গর্ত তৈরি হতে থাকে।

এত কিছুর পরো ১৯৮৭ সাল পর্যন্ত শহরবাসি তেমন কিছুই করেনি, যখন একটি ছেলে এই জ্বলন্ত আগুনে পূর্ণ গর্তে পড়ে যায়। আশ্চর্যজনকভাবে ছেলেটি বেচে ফিরতে সক্ষম হয়। তবে এই ঘটনার পর তারা পুরো ব্যপারটিকে গুরুত্ব সহকারে নিতে শুরু করে।

কনগ্রেস শহরবাসিদের কাছ থেকে পুরো শহরটি কিনে নেয় । প্রায় বেশিরভাগ বাড়ি ঘর পরিত্যাক্ত কিংবা ভেঙ্গে ফেলা হয়, পর্যটকদের ঠেকাতে মানচিত্র থেকে মুছে ফেলা হয় শহরটিকে, যা একে মানবজনহীন ভুতুড়ে শহরে পরিনত করে। এত কিছুর পরো খুব অল্প সংখ্যক মানুষ সেখানে এখনো রয়ে গেছে।

এখনো পর্যন্ত সেই শহরটিতে আগুন জলছে, এবং যা আরো শত বছর জ্বলবে বলে ধারনা করা হচ্ছে।

Leave a Reply