হরর ( ভুতুড়ে ) গল্প – দ্যা কেবিন

হরর ( ভুতুড়ে ) গল্প - দ্যা কেবিন

দ্যা কেবিন

আমি আর আমার ফিয়ান্সে ক্যালিফোর্নিয়ায় থাকি । কিন্তু ওর ফ্যামিলি থাকে কলরাডোতে এবং তাদের একটা ক্যাবিন আছে পাইকস পিক’এ,পাহাড়ি এলাকার একবারে গভীরে । তাদের সাথে দেখা করার সময় তারা আমাদেরকে কয়দিনের জন্য কেবিন টা ঘুরে আসার বুদ্ধি দিল ।

এলাকাটা গুজব ও লোকগাথায় পরিপূরণ । একসময় অঞ্চলটি ছিল গ্রাম্য লোকদের বাসস্থান । তাদের অল্প কিছু অংশ রয়ে গেছে আর তারাই এই লোকগাথা আর গল্প গুলোকে বাচিয়ে রেখেছে । পাইকস পিক’ও এর ব্যাতিক্রম নয় । তাই দুজনেই ঠিক করেছিলাম একটা ট্রিপ দিয়ে দেব ওখানে, ভাল একটা অ্যাডভেঞ্চার হয়ে যাবে ।

কেবিনটিতে আমরা আছি প্রায় চারদিন হলো । আজই কথা ছিল ফিরে যাবার , কিন্তু সব কিছু কেমন যেন গোলমেলে হয়ে গেছে । এবং অবস্থা দেকে মনে হচ্ছে আজ যাওয়া হবেনা । কেবিনে পুরো শীতটা কাটিয়ে দেবার মত রসদ আছে, হিটার টাও কাজ করছে । তবে নেটওয়ার্কের অবস্থা খুবই করুন । ওয়াই ফাই একবারেই পাওয়া যাচ্ছেনা । মোবাইলের নেটওয়ার্কের কাটাও শূন্যের কোঠায় ।

আমরা মানব সমাজ থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন বোধ করছিলাম। বোধহয় একজন অপরজনকে বিচলিত না করার জন্যই অনুভুতিটা নিজদের মনের ভেতরেই রেখেছি । যদিও তা আমাদের চোখেমুখে ছিল প্রকট ।

প্রথম যে অদ্ভূদ ঘটনা টা ঘটেছিল তা হল তুষারপাত, আবহাওয়া পুরোপুরি রৌদ্র উজ্জল জেনেই ঘর থেকে বেড়িয়া ছিলাম, ওয়েদার ফোরকাস্ট’এ তুষার পাতের কোন আভাস না পেয়ে নিশ্চিন্তই ছিলাম । আবহাওয়া ভাল থাকার কারনে আমরা বেশি কিছু সাথে নেবার প্রয়োজন বোধ করিনি ।

কিন্তু এখন শুরু হয়েছে প্রচণ্ড তুষার পাত । বাইরে দাড়া করানো আমার ছোট গাড়ীটি প্রকৃতপক্ষে এখন একটা বরফের টুকরো ছাড়া কিছু নয় । ওটা দিয়ে কোনভাবেই এই দুর্যোগের মধ্যে ৬ মাইল রাস্তা পার হওয়া সম্ভব নয় । আমি কলরাডো কে বিশ্বাস করি শুধু মাত্র বসন্ত কালে ,আর এই ঝড়ে কলরাডো আমার পরিচিতদের তালিকায় পড়েনা ।

 

সারাদিন হাইকিং শেষে যখন কেবিনে ফিরে ছিলাম, অদ্ভুদ একটা ব্যাপার লক্ষ করলাম । পেছনের দরজা থেকে প্রায় ১২-১৩ গজ দুরে একটা গাছে এক বিশাল আকৃতির ড্রিম ক্যাচার ঝুলানো দেখতে পেলাম, এটা দোকানে পালক লাগানো যেগুলো পাওয়া যায় সেরকম তো নয়ই, তাঁর ধারে কাছেও নেই । প্রায় তিন হাত লম্বা,ডালপালা দিয়ে বানান । আমি বা আমার ফিয়ান্সে, দুজনের একজনও ওটার ধারে কাছেও গেলাম না । হরর মুভি দেখে দেখে এই একটা জিনিস আমরা দুজনেই জানতাম যে এসব পুরনো ইন্ডিয়ান জিনিসে হাত দেয়া টা অভিশাপ লাগানোর ভাল একটা উপায় ।

ঠিক করলাম তুষার পাত কমার পর বরফ গলা শুরু হলে কয়েকটা ফটো তুলে নেটে পোস্ট দেব । একই রাতে যখন ডিনার সারছিলাম তখন অদ্ভুদ সব আওয়াজ আসা শুরু করলো বাইরের জঙ্গল থেকে । ডালপালার গা শির শির করা খড়মড় আওয়াজ, যদিও তা অপ্রত্যাশিত কিছু ছিলনা ,বিশেষত জঙ্গলের পাশে কেবিন থাকলে এসব আওয়াজ শুনেই থাকতে হয় ।

তাছাড়া আসার সময় দূরে কিছু হরিন দেখেছিলাম ,জংগলটি বন্যপ্রাণী শুন্য নয় । অদ্ভুদ ব্যাপারটা ছিল আওয়াজ টা এলোমেলো কোন আওয়াজ ছিলনা, তাঁর মধ্যে একটা ছন্দ ছিল । মনে হচ্ছিল কেউ আমাদের কেবিন টার চারপাশে চক্কর দিচ্ছে ।

হরর ( ভুতুড়ে ) গল্প - দ্যা কেবিন

শুক্রবার সারাদিনটা রুমেই কাটিয়ে দিলাম গল্প গুজব আর বোর্ড গেম দিয়ে । বাইরে আগেরদিনের মতই তুষারপাত হয়েছে । সন্ধ্যাবেলা আবারো সেই শব্দ । রাত তিনটার দিকে ও আমাকে জাগিয়ে বললো বাইরে থেকে কিসের যেন গলার আওয়াজ শুনেছে । আমি কান খাড়া করে শোনার চেষ্টা করলাম ।

আওয়াজটা অদ্ভুদ, একজন পুরুষ মানুষের কান্নার আওয়াজ , শুনে মনে হচ্ছে বেশ দূর থেকেই আসছে ,আর বাতাসের কারনে অনেকটা অস্পষ্ট তাই নিশ্চিত হতে পারলাম না কি শুনেছি । তাই দুজন আবার ঘুমাতে গেলাম ।


কিন্তু রাত চারটার দিকে আবারো ঘুম ভেঙ্গে গেল আমাদের দুজনারই । একই গলার আওয়াজ,তবে এবার আসছে আরও কাছ থেকে আর আগের থেকে পরিস্কার ভাবে । শুনে মনে হচ্ছে একজন লোক সাহায্যের জন্য চেচাচ্ছে কিন্তু ভাষাটা বুঝতে পারলাম না ।

আমরা বনরক্ষীদের নাম্বারে কল করে ব্যাপারটা জানালাম ,তারা বললো যে ব্যাপারটা অনুসন্ধান করে দেখবে । যদিও তাদের দেখা পাওয়া গেলনা, সন্দেহ হল যে তারা হয়তো ব্যাপারটাকে একেবারেই গুরুত্তসহকারে নেয়নি । এসে একবার খোজ নিয়েছে কিন তাতেও সন্দেহ আছে ।

পরের দিন মিনা অকারনেই খুব ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়ল । অকারনে কথাটা হয়ত পুরোপুরি সত্যি নয় । সারাদিন আবারো তুষার পড়লো,তাই আজো আর কিছু করা হলনা । মিনা আর আমি সন্ধ্যা বেলা মুভি দেখতে বসলাম । রাতে আলোচনা আর জমল না । আটটা নাগাদই ও শুয়ে পড়লো । আর আমি পাশের রুমে ল্যাপটপে ফটো এডিট করতে বসলাম ।

হঠাৎ ও জেগে উঠলো চীৎকার দিয়ে কাদতে কাদতে । ছুটে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম কি হয়েছে । উত্তর দিল,ও একটা দুঃস্বপ্ন দেখেছে যে ও বাইরে বনের ভেতর হারিয়ে গেছে আর কিছু একটা ওকে তাড়া করেছে । ওকে অভয় দিয়ে আমিও ওর পাশে শুয়ে পড়লাম,বললাম ভয়ের কিছু নেই । ঘুম পাড়ানোর জন্য মাথায় হাত বুলিয়ে দিলাম, সাথে সাথে আমিও ঘুমিয়ে পড়লাম ।

রাত একটার দিকে আবারো ঘুম ভেঙে গেল । দেখি ও উঠে বসে আছে, কখনোই ওকে এতটা ভয় পেতে দেখিনি । শুধু ওর চোখের ভিত দৃষ্টি দেখে বিচলিত হয়ে পড়লাম । ও বললো যে ও নাকি আবারো ওই লোকটার গলার স্বর শুনেছে ,আর ও পুরোপুরি নিশ্চিত যে এটা ওর দাদা’র কন্ঠসর ,সে যেন বাইরে ছূটোছুটি করছে আর সাহায্যের জন্য চীৎকার করছে ।

ওর দাদা চার বছর আগে, আমরা যখন কলেজে তখন তিনি মারা গেছেন।

আমি বললাম যে ও স্বপ্ন দেখেছে । কিন্তু অতি শীঘ্রই আমিও শুনতে পেলাম ! লোকটার সাথে আমার পরিচয়ের সুযোগ হয়নি তাই গলার স্বর চেনার কথা নয় । তবে আগের রাতের চেয়ে গলার আওয়াজ টা আলাদা মনে হচ্ছিল, মনে হচ্ছিল বয়স্ক মানুষের কণ্ঠস্বর । আমার পক্ষে যা করা সম্ভব ছিল তাই করতে হয়েছে ওকে দরজা খুলে বাইরে বেড়িয়ে যাওয়া থেকে থামাতে । কিছুক্ষনের মধ্যে ও’ও বুঝতে পারলো যে আওয়াজ টা ওর দাদুর হবার সম্ভবনা যে একেবারেই নেই । আমি একটা মুভি অন করে ভলিউম কিছুটা বাড়িয়ে দিয়ে ওকে নিয়ে শুয়ে পড়লাম ।

শনিবার রাতের ঘটনা টার কারনে আমার স্নায়ু টান টান হয়ে আছে,আর ওর অবস্থার কথা নাইবা বললাম । রাতের বেলা আবারো সেই কান্নার আওয়াজ । রাত একটার কাছাকাছি সময় । আমি জেগেই ছিলাম, আওয়াজ টা যেন একরকম প্রত্যাশিতই ছিল । এবার গলার স্বরটা ছিল একটা মহিলার । ভাগ্য ভাল যে এইবার আওয়াজ আসছিল এত দূর থেকে যে ক্ষীণ আওয়াজে ও’র ঘুম ভাঙল না ।

আমি উঠে গিয়ে বাথরুমের জানালাটা কিয়দংশ খুললাম । কনকনে ঠান্ডা বাতাসের ঝাপটা টা আমার কাছে মৃত্যুর পরশের মত মনে হল । এই আবহাওয়ায় কারো পক্ষে বাইরে বেশিক্ষন বেচে থাকার কথা না,অন্তত পক্ষে মিলিটারি গ্রেড গিয়ার ছাড়া । অথচ কেউ একজন এই অসম্ভব ঠাণ্ডার মধ্যে বাইরে হেটে বেড়াচ্ছে আর কাঁদছে । পুরো ব্যপারটাকেই আমার একরকম পারলৌকিক মনে হল । আমি এসব ব্যাপারে অনেকটা বেপরোয়াভাবেই অবিশ্বাসী ।

এসব ব্যাপারে বিশ্বাস আমার কাছে হাস্যকর বলে মনে হয় । অথচ এই রাতে মানব সমাজ থেকে বিছিন্ন অবস্থায় এই মুহূর্তে ভেসে আসা কান্নার আওয়াজ টা আবিকল আমার মায়ের কন্ঠসর বলে মনে হচ্ছে ! নিজের কান কেই বিশ্বাস হচ্ছেনা । আমার মা বেচে আছে,বহাল তবিয়তেই, সাউথারন ক্যালিফোর্নিয়ায় । আর নিজের মায়ের গলার স্বর কে না চেনে , আর আমি প্রায় নব্বই পারসেণ্ট নিশ্চিত যে ওটা আমার মায়ের গলার স্বর !

আমি আমার হাইকিং বুট পরে নিলাম । দরজা খুলে পুরো কেবিনটার একবার চক্কর দিয়ে দেখলাম বাইরে থেকে, তুষারের মাঝে কিছুটা জায়গা এমন ভাবে সরানো যেন দেখে মনে হচ্ছে কেউ একজন এলোমেলো পদক্ষেপে এখান দিয়ে হেটে গেছে ! হয়ত কেউ আহত হয়েছে ,ভাবলাম । ভেজা তুষারের মধ্য দিয়ে যাওয়া পায়ের ছাপ জোড়া গেছে সোজা বাথরুমের জানলা বরাবর ,তারপর পুনরায় বনের দিকে । প্রতিবারই যখন স্বর শুনলাম, ডাক দিলাম,

‘মম’ ?

‘কে ওখানে ? তুমি কে ? ’

প্রতিবার আমার ডাকে সারা দিয়েই যেন কান্নার স্বর টা বনের ভেতরে দূরে চলে যেতে লাগলো । আমি অনেকটা নিশ্চিত হয়ে গেলাম যে স্বরটা আমাকে কেবিন থেকে দূরে বনের গভীরে নিয়ে যেতে চাইছে ! আমি এখন বেচে আছি কারন আমি আহাম্মক নই । হরর মুভির এক নির্বোধের মত গভীর বনের মাঝে গিয়ে আমি মরছিনা !

খোজাখুজি বাদ দিয়ে কেবিনে ফিরে গেলাম , আর দরজা জানালা ভালভাবে আটকে দিলাম ।

যেহেতু মোবাইল নেটওয়ারক নেই তাই লেখাটা আমার ব্লগে আপলোড করে দিচ্ছি, রবিবার কলারাডো থেকে, ডিন ।

আজ সোমবার । কাল মিনা’র বাবার আসার কথা ট্রাক নিয়ে । আমার গাড়ি জমে যাওয়া তুষারের ভেতর থেকে টেনে বের করার জন্য ট্রাক টা কাজে লাগবে । আর মাত্র একটা রাত এই জায়গাতে । একইসাথে কিছু ফটো আপলোড করে দিতে মনস্থ করলাম । কেন যেন আসার সময় যতটুকু ভালোলাগা ছিল তাঁর থেকেও বেশি ভাল লাগছে জায়গা টা ছেড়ে যাওয়ার কথা ভেবে ।

নয়টা তিরিশ বাজে । আজ দু’বার অনলাইনে আসার সুযোগ পেলাম । আফসোস হচ্ছে এই ভেবে যে যন্ত্রপাতি আর প্রযুক্তির ব্যপারে একটু বেশী জানা থাকলেই বোধহয় ভাল হত, কিন্তু আমি ইতিহাস পড়াই । আমার পক্ষে ওয়াই ফাই টা ঠিক করা বা জানা সম্ভব নয় যে কখন এটি কাজ করতে মনস্থ করবে । আমি ইমেইল পাঠাতে বা রিসিভ করতে পারি,কিন্তু ওয়েব সাইট থেকে লোড করা আমার কাজ নয় ।

মিনা সকাল থেকেই ভাল বোধ করছেনা । ও পেটে ব্যথায় ভুগছে আর কিছুক্ষন পর পর বমি করছে । খাবারে সমস্যা থাকার কথা না কারন আমি আর ও দুজনে একই খাবারই খেয়েছি আর আমার কিছুই হয়নি । আমি নিশ্চিত নই তবে ও যখন কোন কারনে অতিরিক্ত উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে তখন মাঝে মাঝে এরকম হয় ।

আমি যদিও এথিয়েস্ট কিন্তু ও ক্যাথলিক, আর ও একটি ব্যাপারে বেশ নিশ্চিত যে এখানে খারাপ আর অস্বাভাবিক কিছু ঘটছে । যদিও এখনি খুব চিন্তার কিছু নেই, ওর জর-টর দেখা হয়নি এখন আর খেয়াল রাখছি যেন আবার পানি শূন্যতায় না ভোগে ।

দেড় ঘণ্টার মত হয়েছে শু’তে গেছে । এখন বাইরে ডালপালার সেই অতি পরিচিত শব্দের মাঝে ফিসফিস করার শব্দ, শুনেছিলাম মানুষ কোন কিছু বারবার শুনলে তাতে অভ্যস্ত হয়ে পরে তবে কেন যেন এই জনশূন্য বনের মাঝে কেবিনে বসে এই ফিস ফিস করার শব্দ টি কে বনে অন্যান্য প্রাকৃতিক শব্দ গুলোর সাথে মেলাতে পারছিনা । আর শুনে মনে হল শব্দ টার উৎস বনের ভেতরে আরও দূরে কারন গাছপালার শুরু মাত্র বিশ গজের মত দূর থেকেই হবে এছাড়া জানালা দিয়ে দূরে বনের মাঝে কি যেন দেখলান বলে মনে হল, হয়তোবা কোন আন্টিলোপ হবে হয়ত ভাল করে বোঝা যাচ্ছেনা এত দুর থেকে ।

সব জানালা গুলো বন্ধই রেখেছি আর কিছুক্ষন পর পর বেড রুমে গিয়ে মিনার অবস্থা দেখে আসছি । আর দরজাগুলো ভালভাবে বন্ধ করে তারপর ভারী ফার্নিচার দিয়ে আটকে দিয়েছি । এই কাজের কথা ভেবে শহরে কোন একসময় হয়তো হাসবো , কিন্তু এখানে বসে এইটুকু নিরাপত্তা নিশ্চিত করে মনে মনে বরং কিছুটা স্বস্তিই পাচ্ছি ।

আবহাওয়া ভালভাবে না জেনে এখানে এসে নিজেকে আহাম্মকের মত মনে হচ্ছে, মিনার বাবা এসেছিল তাঁর বন্ধুকে নিয়ে । এখন আমরা গাড়িতে, সে তাঁর ট্রাক নিয়েই আসছে পেছন পেছন ।

এরই মধ্যে অনেক কিছুই ঘটেছে, যার অনেকটাই আমি ভালভাবে বুঝিনি । কিছু কিছু ব্যাপার রেকর্ড করেও রেখেছি । আগের রাতটা জেগেই কাটিয়ে দেবার চেষ্টা করেছিলাম বিশেষ করে অন্তত পক্ষে ১টা পর্যন্ত কারন শেষ কয়দিন ধরে রাতের ঠিক ওই সময়টাতেই বাইরের ডালপালার মচমচ শব্দ আর তুষারপাতের সাথে মানুসের ফিসফিসানি যোগ হতো ।

তবে চেষ্টা সফল হয়নি, টের পাইনি কখন ঘুমিয়ে পড়েছিলাম ল্যাপটপ অন রেখেই, মনে হয় বারটা’র দিকে । আর ঠিক একটা পনের তে আমার ঘুম ভেঙ্গে যায় চাপা কথোপকথনের শব্দে । মনে হচ্ছিল বাইরে থেকে, তাই জানালার পাশে বসে কথা গুলো বোঝার চেষ্টা করতে ছিলাম ,শুনে মনে হচ্ছিল অনেকটা ভাঙা ভাঙা বাক্য , ‘ক-কয়েকদি….ন, …এটা আমার ন….য়, আমি একা ন….ই’ ।

পর্দা সরিয়ে দেখার চেষ্টা করলাম কে বলছে কথা গুলো । কাউকেই দেখলাম না , ঠিক তখন শুনলাম – ‘এটা আমার বাবা-মার বাসা’ । বুঝতে পারলাম এটা মিনা’র স্বর । ওর ঘুমের ঘোরে কথা বলার অভ্যাস আছে আর মাঝে মধ্যে ঘুমের মধ্যে হাটে । ওর কাছেই শুনেছিলাম যে ছোট বেলা থেকেই ওর নাইট টেরর হতো ।

হেটে বেড রুমে ঢুকলাম ,দেখলাম মিনা ওর অভ্যাসমত উবুর হয়ে ঘুমাচ্ছে, যে ব্যাপারটা আমার কাছে অবাক করার মত মনে হল সেটা ওর ঘুমের ঘোরে বিড় বিড় করা নয়, দেখে মনে হচ্ছিল ও কারো সাথে কথা বলছে যা ওর জন্য অস্বাভাবিক না হলেও ঘোরের মধ্যে যা বলতে ছিল তা শুনে মনে হল ও যেন কারও জেরার মুখে একটার পর একটা প্রশ্নের উত্তর দিয়ে যাচ্ছে ।

মনে হচ্ছিল কেউ যেন ওকে আমার,ওর আর কেবিনের ব্যপারে প্রশ্ন করছে । দ্বিতীয় যে ব্যাপারটি আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল তা হল ঘুমের মাঝে ওই সময় ও কিছুক্ষন পর পর গলার স্বর অন্যরকম করে ফেলছিল,যেন কথাগুলো ও বলছেনা, অন্যকারো মুখ দিয়ে কথা গুলো বের হচ্ছে । আর আমি কখনোই ওকে ঘুম থেকে তুলিনা এই সময় গুলোতে, এর পেছনে একটা কারন আছে । এর পরিবর্তে আমি ওর পিঠে আলতো ভাবে হাত বুলিয়ে দেই,এতে করে আস্তে আস্তে ওর ঘুমের ঘোরে কথা বলা বন্ধ হয়ে যায় আর ও গভীর ঘুমে তলিয়ে যায় ।

এরকম মিনিট খানেক করার পর হঠাৎ আবারও আওয়াজ শুনলাম বাইরে থেকে । আর শব্দ টা মোটা মুটি জোরেই ছিল আর ঠিক তখনি আমার মনে হতে লাগলো প্রথম বারের মত যে আমরা বিপদের মধ্যে আছি । জানলা টা খোলাই ছিল, আমি মোটামুটি নিশ্চিত যে দূরে অন্ধকারে আমি একটা বাচ্চা ছেলে বা মেয়ে কে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছি ! যদিও বুঝতে পারছিলাম না সে কি বলছে তবে আমি মোটামুটি নিঃসন্দেহ যে ওটা ৬-৭ বছরের কোন বাচ্চা ,গান গাইবার চেষ্টা করছে হয়তোবা !

তুষার পাত কিছুটা কমে গেছে , উজ্জ্বল নক্ষত্ররাজির কারনে বনের বেশ কিছুটা অংশ জানালা দিয়ে দেখা যাচ্ছে । তার মাঝে একটা গাছের সামনে দেখলাম লম্বামত একজন লোক দাঁড়িয়ে । সে এতটাই নিশ্চল যে আমি নিজেকে বুঝানোর চেষ্টা করলাম যে ওটা সম্ভবত একটা গাছ’ই হবে আর কয়েকমিনিটের মাথায় তা আবারও ঝাপসা হয়ে গেল ।

ঠিক তখনি দেখলাম যে মিনা বিছানায় বসে রয়েছে, চোখ বন্ধ । ঘাড় ঘুড়িয়ে বিড় বিড় করে যা বললে তাঁর অর্থ দাঁড়ায় যে ‘ওকে ভেতরে আসতে দিওনা’ বা এইধরনেরই কিছু একটা হবে মনে হল । বুঝলাম ও এখনো ঘুমের ঘোরেই কথা বলছে,একই সাথে কারও গলার স্বর নকল করার চেষ্টা করছে । তাই পাশে বসে আস্তে আস্তে ওকে জাগিয়ে তুললাম ।

ঘুম থেকে ওঠার পর ওকে দেখে মনে হল না যে কিছু টের পেয়েছে,তবে চোখমুখ থেকে ভীতির ছাপ এখনো সরেনি । ল্যাম্প জেলে বসে বসে দুজনে এখন আমাদের কি করা উচিৎ তা নিয়ে আলোচনা করা শুরু করলাম । এর মধ্যে একবার অনলাইনে এসে ওর বাবা-মার কাছে একটা ইমেইল পাঠানোর চেষ্টা করেছিলাম । কিন্তু স্বভাবতই ঠিক যখন দরকার তখনি এটা কাজ করা বন্ধ করে দেয় !

আমরা দুজনেই রাজী হলাম যে আজ আর আলাদা হওয়া যাবেনা । তাই একসাথে ঘুমিয়ে পড়ার চেষ্টা করলাম । রাতেরই কোন এক সময় আমি পানি খাবার জন্য উঠেছিলাম, কিচেনে গিয়ে ট্যাপ ছাড়ার সময় হঠাৎ করেই নজরে পড়ল কিচেনের জানালা দিয়ে আলো আসছে দুর থেকে ।

দেখে মনে হলনা যে কেউ ফ্যাশ লাইট নিয়ে বনে হাটছে, বরং অনেকটা লন্ঠন টাইপের কিছু যেন তা আস্তে আস্তে নিভানো সম্ভব হয় । ঘরের ভেতর দিয়ে সুইচ টিপে বাইরের বাতি টা জেলে দিলাম এই আশায় যে বাইরে যেই থাকুক না কেন যেন আর আগাতে সাহস না পায় । কিন্তু যখন বেড রুমে পৌছালাম ঠিক তখনি দেখলাম জানালার কাচে কে যেন হাত দিয়ে দাড়িয়ে আছে !

যেহেতু রুমের ভেতর অন্ধকার আর বাইরে অপেক্ষাকৃত কম,তাই স্পষ্টভাবে আকৃতি টা দেখতে পেলাম, যেন কেউ দুই হাত কাচে রেখে উকি দিয়ে দেখার চেষ্টা করছে । আমি দ্রুত এগিয়ে গিয়ে জোরে ডাক দিলাম ‘কে’ বলে । কিন্তু আমি দোড়ে গিয়ে জানলা খুলে দেখার আগেই আকৃতি টা সরে গেল ।

যদিও বাইরে থেকে ফিসফিসানির শব্দটা বন্ধ হয়নি , আলাদা আলাদা গলার স্বর । ভোরের আলো ফোটার আগ পর্যন্ত চললো এভাবে । ঘুম আর আসলোনা, তাই শোয়ার রুমে আর ফিরে গেলাম না ,তবে দরজা টা খুলে রাখলাম যেন মিনা আবার ঘুমের ঘোরে উঠে পড়ে কিনা সেদিকে খেয়াল রাখার জন্য ।

ফিসফিসানি টা কিছুক্ষনের জন্য চলে যেত, আবার ফিরে আসতো । এভাবে এক পর্যায়ে আমি ঘুমের রাজ্যে ঢলে পড়লাম । ঘুম হয়তোবা ভাংতোনা যদিনা হঠাত টের পেলাম যে জানলা দিয়ে আলো আসছে ,বার বার ,জ্বলছে নিভছে অনেকটা একটা প্যাটার্নে ,পাচবার করে । বলতে পারবোনা কেন, খুবই ভয় লাগলো , মনে হচ্ছিল ভয়ানক কোন এক কিছু আমাদের বাসার সামনে দাঁড়িয়ে আছে, আর বিকৃত কোন ঠাট্টা হিসেবে আলো জালাচ্ছে আর নিভাচ্ছে আর হাসছে !

আমার প্রথম যে প্রতিক্রিয়া টা হলো তা হল দৌড়ে গিয়ে দেখলাম মিনা ঠিক আছে কিনা । হৃদপিণ্ড ধরফর করছিল আর যখন দেখলাম বিছানা খালি একেবারে স্ট্রোক করার উপক্রম হল । ঠান্ডা বাতাসের ঝাপ্টায় গা শির শির করে উঠলো , দ্রুত জানালার কাছে গিয়ে উকি দিয়ে দেখলাম ও বাইরে কিনা ।

হতভম্ব হয়ে লক্ষ করলাম ও বসে আছে বাইরে ! বরফে জমে যাওয়া আমার গাড়ির হুড এর উপরে আমার দিকে পিঠ ফিরিয়ে বনের দিকে তাকিয়ে রয়েছে ও । একেবারে নড়াচড়া নেই, ঠিক যেভাবে ঘুমের ঘোরে ঊঠে বসে থাকে যখন সেভাবে !