ত্বকের শুষ্কতা দূর করার উপায় – শুষ্ক ত্বকের যত্ন

ত্বকের শুষ্কতা দূর করার উপায় - শুষ্ক ত্বকের যত্ন

ত্বকের শুষ্কতা দূর করার উপায়

পর্যাপ্ত আর্দ্রতা না থাকলে ত্বক শুষ্ক হয়ে পরে। এটি সাধারণত গুরুতর হয় না তবে বিরক্তিকর হতে পারে। আপনার শুষ্ক ত্বক যদি গুরুতর হয় তবে আপনার ডাক্তার দেখানো উচিত।

ত্বক শুষ্কতার অনেকগুলি কারণ রয়েছে – যা বাইরে তাপমাত্রা থেকে শুরু করে বাতাসে আর্দ্রতা এবং বিভিন্ন ধরণের বিষয়ের উপর নির্ভর করে।

ত্বকের শুষ্কতার প্রকারভেদ

শুষ্ক ত্বক সাধারণত অস্থায়ী হয় তবে শুকনো ত্বকের এমন বিভিন্ন প্রকার রয়েছে যা সারা বছর জুড়ে থাকতে পারে। আপনার শুষ্ক ত্বক যদি দীর্ঘদিন স্থায়ী হয় তবে এটি এই ধরণের একটি হতে পারে:

অ্যাথলেট’স ফুট

আপনার পা যদি শুকনো অনুভব হয় এটি তাহলে অ্যাথলেট’স ফুট সমস্যাও হতে পারে। এই অবস্থাটি, যা ছত্রাকের সংক্রমনে হয়ে থাকে এবং তা আপনার পায়ের ত্বক শুকনো এবং অস্থির করে তুলতে পারে।

ডার্মাটাইটিস

কখনও কখনও আপনার ত্বকের সংস্পর্শে আসা জিনিসগুলি অ্যালার্জিজনিত প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে। ফলে আপনার ত্বক শুষ্ক, চুলকানি এবং লাল হতে পারে। ফুসকুড়ি হতে পারে। এটি মেকআপ পণ্য, ওষুধ, ডিটারজেন্টস বা গহনার ধাতব (নিকেল) পদার্থের মতো জিনিসগুলির কারনে হতে পারে।

একজিমা (এটোপিক ডার্মাটাইটিস)

আপনার ত্বক শুকনো, লাল এবং চুলকানির থাকলে আপনার একজিমা হয়ে থাকতে পারে। এটি আপনার ত্বকে ফাটল ধরাতে পারে। এই ত্বকের অবস্থা আপনার পিতামাতার কাছ থেকে আসতে পারে তবে অ্যালার্জেন, চাপ এবং অন্যান্য বিষয়গুলি একে আরও খারাপ করে তুলতে পারে।

সেভোরিক ডার্মাটাইটিস

আপনার মাথার ত্বক খুব শুষ্ক হলে, আপনি খুশকি হতে পারে। (শিশুদের হলে তাকে ক্রেডল ক্যাপ বলে।) আপনার হাত, পা, কুঁচকিতে, মুখ, কানে বা আপনার নাভির কাছেও শুকনো, খড়খড়ে ত্বক থাকতে পারে।

শুষ্ক ত্বকের লক্ষণগুলি

শুষ্ক ত্বকের কারন মানূষ ভেদে আলাদা হতে পারে। কারণ লক্ষণগুলি আপনার স্বাস্থ্য, বয়স এবং আপনার শুষ্ক ত্বকের প্রকৃত কারণের মতো বিষয়ের উপর নির্ভর করবে। তবে যখন আপনার শুষ্ক ত্বক হবে তখন আপনার নিম্নোক্ত লক্ষণগুলি হতে পারে

  • ফাটলযুক্ত ত্বক (ফাটলগুলি গভীর এবং রক্তপাত হতে পারে)
  • চুলকানি
  • চামড়া উঠে যাওয়া,খড়খড়ে হয়ে যাওয়া কিংবা ভাজ পরা
  • লালভাব
  • রুক্ষ ত্বক বা ধূসর এবং ছাই লাগছে এমন দেখালে
  • ত্বক টানটান অনুভব হওয়া, বিশেষ করে পানি ব্যবহারের পর

শুষ্ক ত্বকের কারণ এবং ঝুঁকি সমূহ

সাধারণত শুষ্ক ত্বক পরিবেশ,আবহাওয়ার মতো ঘটনার কারনে হয়ে থাকে।

শুষ্ক ত্বক হতে পারে যদি

তীব্র ক্ষারযুক্ত ডিটারজেন্ট বা সাবান : সাবান, শ্যাম্পু এবং ডিটারজেন্ট আপনার ত্বকের সংস্পর্শে আসলে তা ত্বকের প্রাকৃতিক তেল সরিয়ে ফেলে। অর্থাৎ এটি ত্বকের আর্দ্রতা নস্ট করে একে শুকিয়ে ফেলতে পারে।

তাপ : হিটার এবং সেন্ট্রাল হিটিং থেকে ফায়ারপ্লেস এবং কাঠের চুলার মত যে কোনও তাপের উৎস ঘরের আর্দ্রতা কমিয়ে আপনার ত্বককে শুষ্ক করে তুলতে পারে।

গরম ঝরনা বা স্নান : দীর্ঘ সময় গরম ঝরনা বা গরম পানিতে গোসল করলে আপনার ত্বক শুষ্ক হতে পারে।

অন্যান্য কারন : সোরিয়াসিস বা একজিমা জাতীয় কিছু সমস্যার ক্ষেত্রেও শুষ্ক ত্বক হতে পারে।

পুলে সাঁতার কাটা : সুইমিং পুলে ব্যবহ্রত ক্লোরিন এমন একটি রাসায়নিক পদার্থ যা পুল পরিষ্কার রাখে, কিন্ত তা আপনার ত্বক শুকিয়ে ফেলতে পারে।

আবহাওয়া : শীতের সময় আর্দ্রতা এবং তাপমাত্রা কমে যায়। ফলে তা আপনার ত্বককে শুষ্ক করে তুলতে পারে।

যদিও শুষ্ক ত্বক সাধারণ যে কারও হতে পারে, তবে এমন কিছু ব্যপার রয়েছে যা আপনাকে এটি হবার সম্ভাবনা আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে।

নিম্নোক্ত কারণগুলো আপনার শুষ্ক ত্বক হবার সম্ভাবনা বাড়াতে পারে –

ত্বকের শুষ্কতা দূর করার উপায় - শুষ্ক ত্বকের যত্ন

আপনার বয়স

আপনার বয়স ৪০ বা তার বেশি হলে আপনার ত্বক শুষ্ক হবার সম্ভাবনা বেশি। ৫০% এরও বেশি বয়স্কদের ত্বক শুকনো থাকে।

আপনার থাকার জায়গা

আপনি যদি আর্দ্রতাহীন, ঠান্ডা বা শুষ্ক আবহাওয়ায় বাস করেন তবে আপনার এটি হবার সম্ভাবনা বাড়বে।

আপনার কর্মক্ষেত্র

আপনার কর্মক্ষেত্রে যদি আপনার ত্বক প্রায়শই ভিজে যায় তবে ত্বক শুষ্ক হবার সম্ভাবনা বেশি থাকে। সাঁতার প্রশিক্ষক এবং হেয়ারস্টাইলিস্টদের প্রায়শই তাদের ত্বকে পানি লাগে।

আপনার জিন

কিছু কিছু মানূষের ক্ষেত্রে এই স্বাস্থ্য সমস্যা আসে তাদের পিতামাতার কাছ থেকে। এর মধ্যে থাইরয়েড এবং অন্যান্য হরমোনজনিত অসুস্থতার পাশাপাশি একজিমা, ডায়াবেটিস এবং কিডনি রোগ রয়েছে।

শুষ্ক ত্বকের চিকিৎসা

শুষ্ক ত্বক যখন গৃহস্থালির কোন কারনে হয় তখন এর কারন অনেক কিছুই হতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে পরিষ্কার করার পণ্য, মেঝে পলিশ, এয়ার ফ্রেশনার এবং লন্ড্রি ডিটারজেন্ট ইত্যাদি। এই পণ্যগুলি ত্বকের আদ্রতা সরিয়ে ফেলে পরিণামে ত্বক শুষ্ক হতে পারে এবং জ্বালাপোড়াও হতে পারে। কিছু লোকের জন্য শুকনো ত্বক আরও বেশি গুরুতর অবস্থায় রুপান্তরিত হতে পারে যেমন একজিমা বা ডার্মাটাইটিস।

শুষ্ক ত্বকের যত্ন

নিম্নোক্ত উপায়ে আপনি আপনার বাড়িকে আপনার ত্বকের জন্য নিরাপদ করে তুলতে পারেন:

ঘরের কাজের জন্য গ্লাভস পরুন

আপনার হাতের যত্ন নেওয়ার জন্য আপনাকে এদের গৃহস্থালির পরিষ্কার করার ক্লীনার এবং ডিশওয়াশিং ডিটারজেন্টগুলি থেকে রক্ষা করতে হবে। স্ক্রাব করার সময় নন-ল্যাটেক্স রাবারের গ্লাভস ব্যবহার করুন। কিংবা আরও ভাল হয় যদি, সুরক্ষা দ্বিগুণ করে নিন, সুতি কাপড়ের পাতলা গ্লাভস আগে পড়ে তার ওপর রাবারের গ্লাভস পড়ুন।

শাওয়ার এবং সাঁতারের পরে ময়শ্চারাইজ

পুল পরিষ্কার রাখতে ক্লোরিনের ব্যবহার আপনার ত্বককে শুকিয়ে ফেলতে পারে। সর্বোত্তম উপয় হতে পারে, আপনি বা আপনার শিশুদের পুলের বাইরে নেবার ​​সাথে সাথেই জল এবং হালকা সাবান দিয়ে ধুয়ে ফেলুন। এবং এরপর ময়শ্চারাইজারের ব্যবহার করুন এবং এতে গ্লিসারিনকে প্রথম উপাদান হিসাবে রাখতে পারেন। এটি আপনার ত্বককে আর্দ্রতা ধরে রাখতে এবং ভবিষ্যতের শুষ্কতা রোধে সহায়তা করবে।

নারকেল তেল ব্যবহার করে দেখুন

এতে প্রয়োজনীয় ফ্যাটি অ্যাসিড (ইএফএ’গুলো) রয়েছে বলে নারকেল তেল আপনার ত্বক আদ্র এবং সুরক্ষিত রাখতে সহায়তা করতে পারে। আপনার ত্বকের আর্দ্রতা বজায় রাখতে আপনার ডায়েটে এটি যুক্ত করার বিষয়ে আপনার ডাক্তারকে জিজ্ঞাসা করুন। আপনি এটি ময়েশ্চারাইজার হিসাবেও ব্যবহার করতে পারেন এবং এটি ত্বকে ঘষতে পারেন।

পেট্রোলিয়াম জেলি মাখুন

আপনার যদি সংবেদনশীল ত্বক থাকে যা ঘরোয়া জিনিসের দ্বারা সহজেই প্রভাবিত হয় তবে সর্বোত্তম চিকিৎসা সেটাই যাতে খুব কম ধরনের উপাদান রয়েছে। অ্যালার্জি সৃষ্টিকারী গৃহস্থালি পণ্যগুলি ত্বকে লাগলে তারা এর প্রতিরক্ষামূলক বাধা ভেঙে দেয়।

এরপর দুর্বল হয়ে যাওয়া জায়গাগুলির উপরে রাসায়নিক পদার্থ যুক্ত ক্লীনার বা ওয়াশিং লিকুইড লাগলে জালাপোড়া হতে পারে, চুলকানি এবং লাল হয়ে যেতে পারে।

যেহেতু কেবল একটি উপাদান রয়েছে বলে পেট্রোলিয়াম জেলি আপনার ত্বকের জন্য নমনীয়। আপনি এটি শুকনো ত্বককে নরম করতে ব্যবহার করতে পারেন, আপনার ঠোঁট থেকে আপনার পা পর্যন্ত ব্যবহারে যেহেতু এটি নিরাপদ এবং কম ব্যয়বহুল, আপনি এটি আপনার পছন্দমতো প্রয়োগ করতে পারেন।

ওটমিল গোসল নিন

ওটস বহু শতাব্দী ধরে শুষ্ক ত্বকের চিকিৎসার জন্য ব্যবহৃত হয়ে আসছে। তবে সম্প্রতি গবেষকরা আবিষ্কার করেছেন এটি চুলকানি কমাতে সাহায্য করে। এতে অবস্থিত অ্যানভেনথ্রামাইডস নামক পদার্থ যা প্রদাহ এবং লাল হয়ে যাওয়ার বিরুদ্ধে লড়াই করে।

ওটসের চুলকানি প্রতিরোধি গূণ পেতে এদের হালকা গরম জলে ফেলুন। ব্লেন্ডার বা ফুড প্রসেসরে দ্রুত বা পুরানো ফ্যাশনে ওটমিলটি গ্রাইন্ড করুন এবং ধীরে ধীরে পানির সাথে সাথে এটি বাথটাবে ছড়িয়ে দিন। কমপক্ষে ১৫ মিনিট ভিজিয়ে রাখুন।

ধূলিকনায় বাস করা জীবানু দূর করুন

আপনার পরিবারের ঘরের প্রতিটি কোনে কোনে ত্বকের সংক্রমন সৃষ্টিকারী বাস করে, যা হলো ধূলিকণার মাইট। মাইট দাঁড়া সৃষ্ট চুলকানি এবং ত্বকের জালাপোড়া রোধে নিয়মিত মেঝে এবং গালিচা পরিস্কার করুন, এছাড়া কমপক্ষে ১৩০ ডিগ্রি ফারেনহাইট তাপমাত্রায় বিছানার চাদর ও ব্যবহার্য কাপড় ধৌত করুন।

আদ্র হ্যান্ড স্যানিটাইজার ব্যবহার করুন

আপনি হ্যান্ড স্যানিটাইজার ব্যবহার না করে কোথাও যেতে পারবেননা আজকাল। এবং অনেক পরিবার দ্রুত এবং সহজে হাত পরিষ্কারের জন্য ঘরে হ্যান্ড স্যানিটাইজারের বোতল রাখে।

তবে অ্যালকোহল ভিত্তিক স্যানিটাইজারগুলি সত্যিকার অর্থেই আপনার হাত শুকিয়ে ফেলতে পারে। হাইড্রেটিং সংস্করণগুলির সন্ধান করুন যাদের লেবেলে “ডারামটোলোজিস্ট রিকমেন্ডেড” লেখা থাকে।

অ্যান্টিঅক্সিডেন্টস এবং ওমেগা – ৩

আপনার ত্বক যখন শুষ্ক থাকে, এর অর্থ হলো আপনি একে এমন সব উপাদানগুলির সাথে এক্সপোজ করছেন যেগুলি আপনার শরীর তার ত্বকের কোষগুলিকে যত দ্রুত মেরামত করছে এরা তার তুলনায় দ্রুত ত্বকের কোষগুলিকে ক্ষতিগ্রস্থ করছে। এমন কিছু খাবার রয়েছে যা আপনার ত্বককে স্বাস্থ্যকর রাখতে সহায়তা করতে পারে।

অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ খাবারগুলি বিষাক্ত পদার্থের দ্বারা কৃত ক্ষয় হ্রাস করতে পারে এবং আপনার শরীরকে স্বাস্থ্যকর কোষ তৈরি করতে সহায়তা করতে পারে। ত্বকের স্বাস্থ্যে অবদান রাখে এমন কিছু খাবারের মধ্যে রয়েছে:

  • ব্লু বেরী
  • টমেটো
  • গাজর
  • মটরশুটি
  • মটর
  • মসুর ডাল

ওমেগা -৩ ফ্যাটি অ্যাসিড সমৃদ্ধ খাবার যেমন স্যালমন, ত্বকের উজ্জলতা বৃদ্ধিতে অবদান রাখতে পারে।

সাস্থবিষয়ক আরও কিছু লেখা পড়ুন –
চুলের যত্ন সম্পর্কে আপনার যা যা জানা প্রয়োজন
বাত সম্পর্কে আপনার যা যা জানা প্রয়োজন
মহিলাদের জন্য সুপার খাবার
মাড়ির রোগের সাথে উচ্চ রক্তচাপের সম্পর্ক !

তথ্য সুত্রঃ
Dry skin – Symptoms and causes – Mayo Clinic