ভোপালের কান্না

নব্য প্রস্তর যুগের শুরু হয় প্রায় ১২,০০০ বছর আগে। কৃষি বিপ্লব দিয়ে মানুষ অগ্রসর হতে থাকে আধুনিক যুগের দিকে যেখানে মানুষের চাহিদা আর যোগানের মধ্যে বিস্তর পার্থক্য সবসময়ই বিদ্যমান থাকে। তাই দরকার হয় অল্প মজুদে বিস্তর উৎপাদন। আর এক্ষেত্রেই দরকার হয় রাসায়নিক চালিকা শক্তির। আর সেই শিল্প বিপ্লবের যুগ থেকেই শিল্প কারখানাতে রাসায়নিক দ্রব্যের ব্যাবহার হচ্ছে। তবে আধুনিক যুগের চাহিদার যোগান মিটাতে গিয়ে ধ্বংস হচ্ছে পরিবেশ। যুগে যুগে ঘটছে রাসায়নিক বিপর্যয়, যা আজকের আলোচ্য বিষয়।

শুধু ভারতীয় উপমহাদেশেরই নয়, মানব ইতিহাসের অন্যতম বড় রাসায়নিক বিপর্যয় হচ্ছে  ভোপাল গ্যাস দুর্ঘটনা যেখানে প্রাণ হারায় ১৫,০০০ মানুষ, আর আক্রান্ত হন প্রায় ১৫০,০০০ থেকে ৬০০,০০০।

১৯৮৪ সালের ডিসেম্বরের ৩ তারিখ। শীতের রাতে ঘুমাচ্ছিল ভোপাল শহরের নিরীহ জনগন। কে জানতো, হয়তো এই ঘুমই হবে শেষ ঘুম। রাত প্রায় ১২ টার পরে মার্কিন মালিকানাধীন ইউনিয়ন কার্বাইড কীটনাশক কারখানার ভূর্গভস্থ মজুত ট্যাংক ফেটে যায়। তারপর ৪০ টন পরিমাণ বিষাক্ত গ্যাস মিথাইল আইসোসায়ানেট মিশে যায় ভোপাল শহরের বাতাসে।

তৈরি হয় ইতিহাসের নেক্কারজনক ঘটনা। প্রথম ২৪ ঘণ্টায় প্রাণ হারায় প্রায় তিন হাজার মানুষ। ফুস্ফুস প্রদাহের দুর্ভোগ এখনও পোহাচ্ছে সেই নগরীর মানুষেরা। ওই অঞ্চলে জন্ম নেয়া শিশুরা বিকলঙ্গ হয়ে জন্মাচ্ছে।  প্রতিবন্ধী হয়ে জন্মগ্রহণ করছে ভোপালের অনেক শিশু। সেরিব্রাল পালসি এবং মানসিক-বিকাশজনিত সমস্যায় ভুগতে হচ্ছে ভোপালের শিশুকে। ওই সময়ে যারা বেঁচে ছিল তদের অনেকেই এখনও শ্বাস কষ্টে ভুগছে ।

এখন পর্যন্তও ওই অঞ্চলের পানি ব্যাবহার করা স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। এই কারনে এখনও হোস পাইপের মাধ্যমে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ করা হয়।

তবে এই নেক্কারজনক ঘটনার জন্য দায়ীরা কি যথার্থ সাজা পেয়েছিল? মার্কিন মালিকানাধীন ইউনিয়ন কার্বাইডের কাউকেই কাঠগড়ায় দাড়াতে হয় নি। ওয়ারেন অ্যান্ডারসন ঘটনাস্থল দেখতে আসলে তাকে গ্রেপ্তার করার পরেও ছেড়ে দেয়া হয়। কারন ক্ষমতা আর টাকার কাছে মানুষের জীবনের মূল্য সবসময়ই কম ছিল। তৃতীয় বিশ্বে মানুষের জীবনের দাম নেই বললেই চলে, এ যেন তার জলজ্যান্ত প্রমান। মার্কিন খুদা মিটাতে এভাবেই প্রাণ হারাতে হয়েছে ভোপালের ঘুমন্ত নাগরিকদের। কর্পোরেট জগতের লোভের স্বীকার হতে হয় এভাবেই। ধ্বংস হচ্ছে মানুষ, তার পরিবেশ।