প্রতিবিম্ব – হরর গল্প ( অনুবাদ )

হরর গল্প “প্রতিবিম্ব”

আমি কিন্তু বধির হয়ে জন্ম নেইনি। বরং শিশুকালে বেশ ভালই শুনতে পেতাম। আমার খেয়াল আছে, সেই সময় গুলোতে ঘুমোতে কস্ট হত আমার, বাবা মার ঝগড়ার শব্দ শুনতাম। কিন্তু বয়স বাড়ার সাথে সাথে তারা কি বলতো বুঝতে কস্ট হত এক রাতে, তাদের শুনতেই পেলাম না। ভাবলাম আজ হয়তো ঝগড়া কিছু পায়নি তারা। কিন্তু পরের দিন একই নিরবতায় বুঝলাম কিছু একটা হয়েছে। সব কিছু কেমন যেন নিরব হয়ে যেতে শুরু করে। আমাকে বুঝাতে আমার বাবা-মা’কে কথা পুনরাব্রিত্তি করা শুরু করতে হয় । 

 ক্লাসেও পেছনের বেঞ্চে বসে টিচারদের কথা অস্পস্ট শুনতাম। আমার পিতামাতা ব্যপারটাকে গুরুতব দেয়নি প্রথমে। পরে আমি কান্নাকাটি শুরু করলে আমাকে তারা হাসপাতালে নিয়ে যায়। ওইদিন আমরা জানতে পারে যে আমি জন্মগত এক সমস্যা নিয়ে জন্মেছি যার ফলে আমার কানের ভেতরে পানি জমে, হিয়ারিং এইড দিয়েও কোণ লাভ হত না। আর সমস্যাটা বয়সের সাথে সাথে বাড়তেই থাকবে। 

স্কুল বধিরদের জন্য উপযুক্ত ব্যবস্থা না থাকায় আমার বাবা-মা সেখান থেকে আমাকে সরিয়ে নেয় আর বাসায় টিউটর রেখে সাইন ল্যাঙ্গুয়েজ শেখানোর ব্যবস্থা করে। তারাও শেখার চেস্টা করেছিল বটে কিন্তু এসব কিছুর আগে থেকেই তারা অত্যন্ত ব্যস্থ মানূষ ছিল। যদিও মুখে কথা বলতে পারতাম কিন্তু ভালভাবে উত্তর দেবার মত যথেস্ট পরিমান সাইন ল্যাঙ্গুয়েজ আমার বাবা-মার জানা ছিল না। 

মাত্র একজনই সময় নিয়ে সাইন ল্যাঙ্গুয়েজ শিখেছিল আমার সাথে কথা বলার জন্য সে ছিল জনাথন, আমার বন্ধু। শ্রবনশক্তি হারানোর আগে প্রায় প্রতিদিন ও আমার বাসায় আসতো ভিডিও গেম খেলার জন্য আর দুনিয়ার যত বাদরামি করতাম আমরা। বধির হয়ে যাওয়ার পর সে প্রতিদিন এসে আমাকে বাধ্য করতো আমার টিচার যেসব সাইন ল্যাঙ্গুয়েজ শিখিয়েছে সেগুলো ওকে শেখাতে।। ওর সাথে পুরোপুরি কথাবারতা চালানো শুরু করতে বেশি একটা সময় লাগেনি। ওর সাথে বন্ধুত্ত দ্রীড় হয়। কিন্তু একই সাথে বাইরের দুনিয়ার সাথে আমার দুরত্ত শুধু বারতেই থাকে। 

নিজের কথা বুঝাতে আমার সাইন ল্যাঙ্গুয়েজ দরকার হতোনা, যেহেতু আমি কথা বলতে পারতাম। কিন্তু বাকি সবাই কি বলতো কিছুই বুঝতাম না সাইন ল্যাঙ্গুয়েজ ছাড়া। আমার বাবা-মা  আমাকে স্কুলে পাঠানোর অনেক চেস্টা করে ব্যরথ হয়। তারা প্রাইভেট স্কুলের ব্যবস্থা করতে পারতো বাসায়, কিন্তু আমি বাসায় সময় সময় একা বসে থাকার আইডিয়াটা মোটেও তাদের ভাল লাগেনি। তাই তারা ঠিক করে আমাকে দূরে পাঠানোর। আমিও বুঝতে পারি, তারা আসলে অনেক কস্টের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছিল, আমারা সাথে তাদের কথা বলতে অনেক সমস্যা হত। তাই তারা একদিন কাগজে লিখে আমাকে জানায় যে আমাকে বোড়ডীং স্কুলে পাঠাবে। 



এটা জানার পর আমি পুরোপুরি ভেঙ্গে পরেছিলাম। জনাথন জানার পর ও সাঙ্ঘাতিক মনমরা হয়ে পরে। পরে আমরা ঠিক করে গ্রীষ্মের যে সময়টুকু আছে সেটুকু মজা করে কাটাতে। কিন্তু একদিন জানালার কাছে গিয়ে দেখলাম জনাথন আমাকে বাদ দিয়েই কিছু ছেলেদের সাথে খেলা শুরু করে দিয়েছে, যাদের সাথে সে কখনই আগে চলেনি! 

আমার চলে যাবার খবরে ও দুঃখ পেয়েছিল তবে বুঝতে পারলাম যে আমার অনুপস্থিতিতে সে আসলে নতুন বন্ধু তৈরি করতে চাচ্ছে যারা তিন মাস পরও থাকবে, যাদের সাথে সে সত্যিকারের কথোপকথন চালাতে পারবে। 

গ্রিষ্ম সবে শুরু হয়েছিল, কিন্তু তখন আমার মনে হচ্ছিল সময়টা তারাতারি চলে গেলেই ভাল যেন আমি চলে যেতে পারি। অবশেষে জনাথন আমাকে জানালার সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলো। আমাকে জানালায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেই ও থমকে গেল। ওর চেহারার হাসি বন্ধ হয়ে সেখানে অপরাধবোধের ছাপ পড়লো। 

আমি দুঃখিত, বলল জনাথন। আমি কিছু না বলে ওর মুখের উপর জানালা বন্ধ করে দিলাম। ওর এই আচরনে আমি অনেক দূঃখ পেলেও শিশুকালের বন্ধুটাকে হারাতেও চাইনি।

শহরটাতে আমার বাকি দিনগূলো এভাবে না কাটিয়ে আমি ঠিক করলাম আমাকে আরো দক্ষ হতে হবে। এমন হতে হবে, যেন মনে না হয় যে আমি কানে শুনতে পাইনা। এতটা দক্ষ হতে হবে কেউ যেন কেউ বুঝতে না পারে যে আমি বধির ।  

সেদিন আমার বাবা-মা কাজে যাবার পর আমি মা’র বেডরুমে গিয়ে বড় আয়নাটার সামনে বসলাম। আয়নার সামনে নিজের চেহারার দিকে তাকিয়ে কথা বলা শুরু করলাম। 

প্রথমে ব্যাপারটা কিছুটা অদ্ভূত লাগলো। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে আমি অনেক মনযোগ্ দিয়ে আমার ঠোটের নড়াচড়া গুলো দেখতে শুরু করলাম যেন কোন শব্দ উচ্চারনের সময় আমার ঠোটের কি পরিবরতন হয় তা বুঝতে পারি। আয়নায় প্রতিবিম্বের সামনে কথা বলার সময় নিজের ঠোটের নড়াচড়া দেখতে দেখতে এভাবে কতক্ষন যে চলে গেল টেরই পাইনি! হঠাত মা’র হাত আমার কাধে পরতে তাকিয়ে দেখলাম যে তারা ফিরে এসেছে। দেখে মাকে মোটেও সন্তুস্ট মনে হলনা। আমার জন্য মা’র বেডরুমে ঢোকাটা একরকম নিষিদ্ধই বলা যায়। 

মা রাগ করলেও রাগ প্রকাশ করে বলার মত যথেস্ট পরিমান সাইন ল্যাঙ্গুয়েজ তার জানা ছিলনা। তাই অনেকটা পিঠে থাপ্পড় দিয়েই রুম থেকে বের করে দিল। 

ওই রাতে আমি ডিনার টেবিলে বাবা আর মায়ের মাঝের চেয়ারে বসে খাচ্ছিলাম আর তাদের সারাদিনে কেমন কাটলো এসব নিয়ে কথা বলা দেখছিলাম।

এর মধে অবশ্য আমার শ্রবনশক্তি পুরোপুরিই চলে গেছে। বোধহয় তাই তারা কথা বলছিল এমন ভাবে যেন আমি সেখান নেই। তারা কি নিয়ে কথা বলছে তা বোঝা সহজ ছিলনা একেবারেই। কিন্তু, কিছু কিছু শব্দ মুখের নড়াচড়া দেখে বুঝতে পারছিলাম। বিশেষ করে আমার নামটা।

পরের দিনও আমি একই কাজ চালিয়ে গেলাম আয়নার সামনে। তবে এবার কয়েক ঘন্টাপর উঠে পরলাম খবরের চ্যানেল দেখার জন্য। 

এইতো! কাছ থেকে চ্যানেলে সংবাদ উপস্থাপকের খবর পরতে দেখার সময় বেশ কিছু শব্দ ধরতে পারলাম। এটা অনেকটা রূটিনের মত হয়ে গেল। তবে আমি বাবা-মা’কে জানতে দিতে চাইনি কি পরিমান খাটুনি দিচ্ছিলাম এতে।। এর কারন্ হল তারা যেন মনে করে যে ব্যপারটা আমার জন্য ন্যাচারাল আর লিপ রিডিংটা ধরে ফেলতে আমার বেশি সময় লাগবেনা। একই সাথে আমাকে বোরডিং স্কুলে পাঠানোটা বোকামি হবে। এটা তাদেরকে বোঝানোর দরকার ছিল যে লিপ রীডিং এ আমি পারফেক্ট না হলেও এটা শুধু সময়ের ব্যপার।

কিছু কিছু দিন একেবারে সহজ ছিল বলা যায়না। বিশেষ করে, প্রথম প্রথম, মুখের নড়াচড়ায় বের হওয়া প্রতিটা শব্দ মুখস্থ করার সময় আয়নায় নিজের ভ্রূ কোচকান দেখতে দেখতে একেবারে বিরক্ত হয়ে গিয়েছিলাম। যদিও সময়ের সাথে সাথে ভ্রূ কোচকানো দূর হয়ে গেল। এমনকি আমার মন খারাপের দিনগূলোতে আমার প্রতিবিম্ব যেন আমারই আরেক রুপ দেখাতো যে চুপে চুপে হাসছে আর আমাকে এগিয়ে যাবার জন্য অনুপ্রেরণা দিচ্ছে। 



গ্রীষ্ম শেষ হতে হতেই পুরো ব্যপারটা আয়ত্তে এসে গেল। অনেক চিৎকার চেচামেচি ঝগড়াও হল যে কিভাবে তারা আমাকে তাড়াতে চায়। অবশ্য স্কুল শুরু হবার আগেই বাবা-মা হার মানলো।

আমি এতদিনে লিপ রিডিং এত ভালভাবে শিখে ফেলেছি যে সামনের সীটে বসে আর টিচার যদি সোজা তাকিয়ে কথা বলতো তাহলে বুঝতে আমার কোন সমস্যাই হতনা। স্কুলের প্রথম দিনেই জনাথনের সাথে দেখা হল। ওর চেহারায় অনেকগুলো ইমোশন খেলা করছিল, তারমধ্যে অপরাধবোধও ছিল। অবশ্য সব থেকে দ্রিশ্যমান ছিল আমাকে দেখে ওর চোখে আনন্দটা। ও আমার নাম ধরে খুশিতে চিৎকার করে উঠলো আর দৌড়ে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরল। জনাথন আমার উপর হাল ছেড়ে দেয়ার ব্যপারটায় খুশি না হলেও অনেকটা খুশি মনেই ওকে মাফ করে দিলাম। যখন ও জানতে পারলো কি পরিমান খাটুনি আমাকে করতে হয়েছে এখানে থাকার জন্য, ও সূদেআসলে তা ফিরিয়ে দিল। ও আমার সাথে একই রুটিন ফালানোর জন্য স্কুলে অনেক খাটাখাটি করল, যা যা মিস করেছি সব কিছু মনযোগ সহকারে বুঝিয়ে দিলো। আর প্রতি দিন হোমওয়ারকেও সাহায্য করা শুরু করলো। 

বছরটা কঠিন থাকলেও পার করে দিতে পারলাম ভালভাবেই। তবে একবারের জন্যও আমি অসাবধান হইনি। প্রতিদিনই যখন স্কুলে বা জনাথনের সাথে থাকতাম না, আয়নার সামনে লিপ রিডিং প্র্যাক্টিস চালাতাম। কারন যত সহজই এখন হয়ে যাক, যতদুর এগিয়েছি, কোন ভাবেই এক ইঞ্চিও পেছনে যেতে চাইছিলাম না।

বছর যেতে যেতে সবার উপর যে বোঝাটা ছিল আমাকে নিয়ে সেটা চলে যেতে শুরু করলো। আমার কারনে সব সময়ই আশেপাশের মানূষদের অনেকটা ধীরে কথা বলতে হত। কিন্তু যতক্ষন পরযন্ত আয়নায় নিজের সাথে কথা বলা চালিয়ে যেতাম সেই সময়গূলোতে ব্যপারটা নিয়ন্ত্রনে থাকতো। আমি বড় হওয়া প্রযন্ত এই প্র্যাক্টিস চালিয়ে গেলাম। এত মধ্যে জনাথন আর আমি শহরে একটা আপারটমেন্টে উঠেছি। ও একটা চাকরী নিয়েছে আর আমি সরকার থেকে প্রতিমাসে প্রতিবন্ধিদের জন্য বরাদ্দক্রিত বেশ ভাল একটা চেক পাচ্ছি । ফলে আয়নার সামনে প্র্যাকটিস করার জন্য যথেস্ট সময় ছিল আমার।

অবশ্য এরই মধ্যে আমি ব্যপারটা নিয়ে মজা করাও শিখে ফেলেছি আর এটাকে নিজের সাথে কথা বলার ভাল একটা সূজোগ হিসেবে নেই। আমি আয়নায় আমার প্রতিবিম্বের দিকে তাকিয়ে জনাথন হয়তো বিয়ে করে চলে যাবে। এই ভয় নিয়ে কথা বলতাম। আবার অনেক সময় হাস্যকর কাজ করতাম, নিজেকে প্রশ্ন করতাম আবার নিজেই উত্তর দিতাম। আবার অনেক সময় প্রতিবিম্বটাকে আলাদা কেউ হিসেবে প্রশ্ন করতাম যেন সে উত্তর দেবে। আর তখনই আসতে আসতে অবস্থা পরিবরতন হতে শুরু করে।

প্রতি দিনই প্রতিবিম্বে আমি নিজের চেহারাটাকে ধীরে ধীরে খারাপ হয়ে যেতে দেখতে শুরু করি। চেহারাটাকে এমন দেখাতো যে চিনতে পারতামনা। দুঃখভারাক্রান্ত এক চেহারা। আমি ভয় পেয়ে নিজেকে জিজ্ঞেস করতে শুরু করলাম, এসব কি হচ্ছে!

আমাকে কেন এত অন্যরকম দেখাচ্ছে ? আমাকে এত অসুখী দেখায় কেন ? একি বড় হয়ে ওঠারই এক প্রভাব ? এটাকি বয়সের প্রভাব ? 

আমি যতই হাসি দিয়ে তাকাতাম, হাসিটা কেমন যেন মেকী মেকী লাগতো আর দূঃখী ভাবটাও লেগে থাকতো আঠার মত। 

একদিন ঘুম থেকে অনেক ক্লান্ত হয়ে উঠলাম, ওইদিন আয়নায় তাকিয়ে যে প্রতিবিম্ব দেখলাম তার সাথে আমার চেহারা বা মনের অবস্থা মোটেও মেলেনা! প্রতিবিম্বটাকে প্রচন্ড আতঙ্কিত দেখচ্ছিল! আমি হাত তুলে নিজের ভ্রূতে হাত দিলাম। আক্রিতিটাকে আয়নায় যেরকম দেখাচ্ছে তার থেকে অন্যরকম লাগলো! প্রতিবিম্বটার সব কিছুই সামান্য অন্যরকম মনে হতে লাগলো। 

বাথরুম দাঁড়ানো অবস্থায় বলে উঠলাম, এসব কি হচ্ছে !!

আমাকে স্তম্ভিত করে দিয়ে প্রতিবিম্বটা উত্তর দিলো ! আমি আসলে ওটার দিকে তাকিয়ে ছিলাম না, চোখের কোণা দিয়ে মুখটা নড়তে দেখে ঠিক বুঝলাম না ওটা কি বলল।। আমার যে কি অবস্থা তা আর বলার অপেক্ষা রাখেনা, হ্রদপিন্ডটা যেন গলায় উঠে আসছে। তবে শরীরটাকে স্থিরভাবেই রাখলাম যেন যা দেখেছি সেটা যদি আবারও ঘটে তা যেন মিস না হয়। আমি এক দ্রিস্টীতে প্রতিবিম্বটার আধা খোলা ঠোটের দিকে তীক্ষ্ণ ভাবে তাকিয়ে থাকলাম। প্রতিবিম্বের শরিরটা খুবই সন্তপরনে। আবারও নড়ে উঠলো। মুখটাও নড়ছে প্রায় বোঝা যায়না এমন ভাবে। কিন্তু আমি যা দেখার দেখে ফেলেছি। 

এবার ওটা যা বলেছে আমি পড়তে পেরেছি। ওটা বলছে, তোমার দোহাই লাগে, থামো। কিংবা আমার কাছে তাই বলেছে বলে মনে হল।

আমি চোখের দিকে তাকালাম, চোখেও অন্যরকম ভাব যা আমার সাথে মিলছেনা। আমি দিধাগ্রস্ত হয়ে পরলাম। কিন্তু আমি আয়নায় প্রতিবিম্বের চোখে চিন্তা আর আতঙ্ক দেখেছি। আমি আরও মনযোগ দিয়ে তাকিয়ে থাকলাম, বোঝার চেস্টা করলাম কোথাও কোন অসবাভাবিক কিছু ঘটছে নাকি।

ঠিক তখনই দেখলাম প্রতিবিম্বের চোখ এক সেকেন্ডের জন্য বাম দিকে তাকালো। আর আমার নিজের চোখ বিস্ময়ে বড় বড় হয় গেল, কিন্তু আমার প্রতিবিম্বের চেহারায় দুশ্চিন্তার ছাপ দেখলাম, দুশ্চিন্তা এ নিয়ে যে আমি বুঝে ফেলছি যে সে যা করছে তা আমার সাথে মিলছে না। আমি আরও কাছে এগিয়ে গেলাম, চোখ মুখে কোন পরিবরতন বা অমিল আছে কিনা মনযোগ্ দিয়ে দেখতে থাকলাম। 

উত্তর পাবো এই আতঙ্ক নিয়েই অনেকটা জিজ্ঞেস করলাম, তুমি কি আমার কথা শুনতে পাচ্ছ ?

আমার প্রতিবিম্বের চোখ দুটো ছানাবড়া হয়ে গেল কথা শুনে।। ওর চোখ আবারও বাম দিকে তাকালো, যা আমার দ্রিস্টি সীমার সামান্য একটু বাইরে।

ওর ঠোট দ্রুত নড়া শুরু করলো। কি বলছে ধরতে কস্ট হচ্ছিল, তবে শেষের অংশটুকু শুনতে পেলাম। ও বলছে, দয়া করে থামো! ওরা দেখছে! ওরা ভাবছে আমি তোমার সাথে কথা বলছি……ওরা ভাবছে!!! এটুকুই ও বলার সূজোগ পেল। আয়নাটা বিশ্রি আওয়াজ করে মাঝখান দিয়ে আমার প্রতিবিম্বসহ চিড়ে গেলো। প্রতিবিম্বটা চলে গেছে !!

আমি অনেকটা সহজপ্রবৃত্তির কারনেই লাফ দিয়ে পেছনে সরে গেলাম। রুমে কিছু একটা আছে ! কিন্তু সেটা শুধু বাথরুমের ভাঙ্গা আয়নাটার মধ্যেই! 

জনাথন-জনাথন !!! রেস্টরুম থেকে বেড়িয়ে চেচিয়ে উঠলাম এই আশায় যে হয়তো ও এখনো অফিসে যায়নি। 

কি হল ! বলল জনাথন । 

সেও আয়না ভাঙ্গার আওয়াজটা শুনেছে। আমি আর ওকে বোঝানোর ঝামেলায় না গিয়ে হাত ধরে রেস্টরুমে নিয়ে আসলাম। ভাঙ্গা আয়না আগের জায়গাতেই আছে। কিন্তু আমার প্রতিবিম্বটা ফিরে এসেছে। ভাঙ্গা আয়নায় হাত বুলিয়ে অনেকটা অসন্তোষ নিয়েই জনাথন  বলল, কাজ থেকে এসে বাড়ির মালিককে বলব ঠিক করে দিতে। আমার অফিসে দেরী হয়ে যাচ্ছে।

আমি ওকে বাধা দিতে চেয়েছিলাম, হাত ধরে যা যা ঘটেছে সব বলতে চেয়েছিলাম। কিন্তু আসলে ঘটলোটা কি ! কি ঘটেছে তা ওকে বোঝানো কোন ধারনাই নেই আমার । তাই ওকে যেতে দিলাম। ও যাবার আগে, ওর প্রতিবিম্বটার দিকে তাকিয়ে আবারও বিষম খেলাম। 

ওটার মুখের ভাবও জনাথনের থেকে আলাদা! আমারটার মতনই দুশ্চিন্তায় ভরা। আমি আমার নিজের প্রতিবিম্বের দিকে তাকালাম কোন একটা উত্তর পাবার জন্য। কিন্তু এবার এই প্রতিবিম্বটাকে অনেক সুখি আর কনফিডেন্ট মনে হল। কিন্তু এই নতুন প্রতিবিম্বটা আমাকে নিপুন ভাবে কপি করতে ছিল। কিন্ত আমি ওকে আমাকে বোকা বানাতে দেবনা। আমি বললাম, আমি জানি তুমি আমার কথা শুনতে পারছো। তারপর বললাম নড়তে। আর মাত্র এক সেকেন্ডের জন্য ও নড়ে উঠলো। আর তখন আবারো আগেরবারের মতনই এবারও ওর চোখ দুটো বাম দিকে তাকালো। 

কিন্তু এবার আর ঐ দিকে তাকালাম না। আমি তাকালাম ওর ঠোটের দিকে, কি বলে তা দেখার জন্য। 

মারফতি এক হাসি দিয়ে ওর মুখটা নড়ে বলল, এই যে ! 

আমি ওর চোখের দিকে তাকিয়ে বুঝলাম যে ও’ও বুঝতে পারছে যে আমি ওর ঠোটের কথা পড়তে পারছি। সে তার ভুরুটা উচু করলো অনেকটা বন্ধুসুলভ ভাবে। কিন্তু এতে আমার অসস্তি আরও বেড়ে গেল। ।

কিন্তু এটা সেই আগের প্রতিবিম্ব না।, যদিও দেখতে আগের প্রতিবিম্বের মতই, আমার মতই! 

ভয় পেয়োনা ! তুমি আমার সাথে কথা বলতে পারো! প্রতিবিম্বটা বলে চলল। ওর দাতালো হাসিতে আমার চেহারাটার হাস্যকর এক রুপের মত লাগছে। তুমি আগের লোকটার সাথে কি নিয়ে কথা বলছিলে ?

আমি নিরবে দাঁড়িয়ে থাকলাম, বুঝতে পারছিলামনা কি উত্তর দেব। 

 ওর হাসি আরও বড় হয়ে গেল, তুমি আমাকে বলতে পারো সবকিছু, তুমি কোন ঝামেলায় পরবেনা, বলইনা ! 

ও এভাবেই বলে চললো, বলে চললো ও কিভাবে আমাকে সাহায্য করতে পারবে শুধু যদি আমি ওকে আমার প্রথম প্রতিবিম্ব কি বলেছে তা জানাই। আমি বাথরুম থেকে বেড়িয়ে আসলাম।

কিন্তু যেদিকেই তাকাই দরজা,জানালা, দরজার হুক সবকিছুতেই আমি শুধু নিজের প্রতিবিম্বই দেখতে পাচ্ছিলাম। হঠাত করেই নিজেকে খুব বিপদগ্রস্থ মনে হচ্ছিল। আমি সারাটাদিন কাটালাম বেডরুমে যেসব জিনিসে প্রতিবিম্ব হয় সেগুলো কাপড় দিতে ঢাকতে ঢাকতে আর জনাথনের জন্য অপেক্ষা করতে থাকলাম। পরের কয়েকটি দিন বেশ সাভাবিক ভাবেই কাটলো। তবে আমি খুব সাবধানে ছিলাম, একবারও সরাসরি নিজের প্রতিবিম্বের দিকে তাকাইনি।

কিন্তু তারপরও যখন বাইরে যাই, জানালায় কিংবা কোন জলাবদ্ধ জায়গায় চোখের কোনায় আমার সেই প্রতিবিম্বটা দেখতে পাই। যখন কেউ খেয়াল করেনা, আমি দেখি ওর মুখ নড়ছে, আমি বুঝতে পারি ও কি বলে। সেই একই কথা, ওর সাথে আমি কথা বলতে পারি, ওর সেই মিথ্যা প্রমিজগুলো।

আর সে শুধু জানতে চায় আমার আগের প্রতিবিম্ব কি বলেছিল। আরও বলে ও আমাকে অনেক মজার গোপন কথা জানাতে পারবে। শুধু আমি যদি ওকে সত্য কথা বলি। আমার মাঝে মধ্যে ইচ্ছে করে বলি। কিন্তু আমি ভাবি, ওদের সেই কথাটা যাই হোক তা লুকানোর জন্য ওরা নিজেদের একজনকে মেরে ফেলছে। কে জানে ওরা আমার মত মানূষকে কি করবে, যদি আমি ওকে বলে দেই!